ঢাকা | বঙ্গাব্দ

ইউনিলিভারের ৮ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, প্রশ্নে ভোক্তা সুরক্ষা?

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Jul 26, 2026 ইং
ইউনিলিভারের ৮ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক, প্রশ্নে ভোক্তা সুরক্ষা? ছবির ক্যাপশন: গবেষণায় ইউনিলিভারের ক্লোজআপ ও পেপসোডেন্টসহ ২৬টি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক শনাক্ত হয়েছে।
ad728
ইউনিলিভারের টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিক: পরিবেশের কথা বলেও ভোক্তাদের সঙ্গে প্রতারণা?
পরিবেশ রক্ষার নানা প্রচারণা, কিন্তু নিজেদের ৮টি টুথপেস্টেই মিলল মাইক্রোপ্লাস্টিক; প্রতিদিন ব্যবহৃত পণ্যে ক্ষুদ্র প্লাস্টিকের উপস্থিতিতে প্রশ্নের মুখে প্রতিষ্ঠানটির পরিবেশবান্ধব অবস্থান

দেশের বাজারে বিক্রি হওয়া টুথপেস্টে প্রথমবারের মতো পরিচালিত বৈজ্ঞানিক গবেষণায় উদ্বেগজনক তথ্য উঠে এসেছে। পরিবেশ ও সামাজিক উন্নয়ন সংস্থা (ইএসডিও)-এর গবেষণায় দেখা গেছে, পরীক্ষা করা ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের মধ্যে ২৬টিতেই মাইক্রোপ্লাস্টিক রয়েছে। এর মধ্যে বহুল ব্যবহৃত ইউনিলিভার বাংলাদেশের ক্লোজআপ ও পেপসোডেন্ট ব্র্যান্ডের আটটি টুথপেস্টেও মিলেছে ক্ষুদ্র প্লাস্টিক কণা।

রোববার (২৬ জুলাই) রাজধানীর লালমাটিয়ায় নিজস্ব কার্যালয়ে ‘মাইক্রোপ্লাস্টিক ইন টুথপেস্ট’ শীর্ষক গবেষণার ফল প্রকাশ করে ইএসডিও। ২০২৫ সালের জুলাই থেকে ২০২৬ সালের জুন পর্যন্ত পরিচালিত এ গবেষণার জন্য দেশের বিভিন্ন সুপারশপ, খুচরা দোকান ও পাইকারি বাজার থেকে স্থানীয় ও আমদানি করা ১৯টি ব্র্যান্ডের ৩৪টি টুথপেস্টের নমুনা সংগ্রহ করা হয়। পরে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের পরিবেশবিজ্ঞান বিভাগের এনভায়রনমেন্টাল হেলথ অ্যান্ড ইকোটক্সিকোলজি ল্যাবরেটরিতে পরীক্ষার মাধ্যমে এসব তথ্য পাওয়া যায়।

গবেষণায় দেখা গেছে, ক্লোজআপ রেড হট ও ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশের প্রতি ১০০ গ্রামে ১৬০টি করে মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা রয়েছে। ক্লোজআপ মেন্থল ফ্রেশ স্যাশেতে পাওয়া গেছে ৪০টি এবং ক্লোজআপ লেমন সি সল্টে ২০টি কণা। অন্যদিকে পেপসোডেন্ট অ্যাডভান্স সল্টে প্রতি ১০০ গ্রামে ১০০টি, সেনসিটিভ এক্সপার্টে ৬০টি, জার্মিচেক প্লাসে ৪০টি এবং শিশুদের জন্য বাজারজাত পেপসোডেন্ট কিডস-অরেঞ্জে ২০টি মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা শনাক্ত হয়েছে।

গবেষণায় প্রতি ১০০ গ্রাম টুথপেস্টে ২০ থেকে ৩২০টি পর্যন্ত মাইক্রোপ্লাস্টিক কণা পাওয়া গেছে। সর্বোচ্চ ৩২০টি কণা শনাক্ত হয়েছে মেডিপ্লাস ফ্লুরাইড জেলে। তবে পরীক্ষিত ৩৪টি নমুনার মধ্যে আটটিতে কোনো শনাক্তযোগ্য মাইক্রোপ্লাস্টিক পাওয়া যায়নি। এর মধ্যে ক্লোজআপ রেড-হট জিংক ফ্রেশ টেকনোলজিও রয়েছে।

ইএসডিও জানিয়েছে, পরীক্ষিত কোনো টুথপেস্টের মোড়ক বা লেবেলে মাইক্রোপ্লাস্টিক বা ব্যবহৃত সিনথেটিক পলিমারের তথ্য উল্লেখ করা হয়নি। ফলে ভোক্তারা না জেনেই এসব পণ্য ব্যবহার করছেন এবং সচেতন সিদ্ধান্ত নেওয়ার সুযোগ থেকেও বঞ্চিত হচ্ছেন।

বছরের পর বছর ধরে প্লাস্টিক দূষণ রোধ, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, পুনর্ব্যবহার এবং পরিবেশ সংরক্ষণে নানা কর্মসূচি পরিচালনা করে আসছে ইউনিলিভার বাংলাদেশ। বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে পরিচ্ছন্ন পরিবেশবিষয়ক ক্যাম্পেইন, প্লাস্টিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা প্রকল্প, তরুণদের প্রশিক্ষণ এবং পরিবেশ সচেতনতামূলক কার্যক্রমে প্রতিষ্ঠানটির সক্রিয় অংশগ্রহণ রয়েছে। কিন্তু একই প্রতিষ্ঠানের বহুল ব্যবহৃত আটটি টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের উপস্থিতি প্রকাশ পাওয়ায় ভোক্তাদের মধ্যে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে—যে প্রতিষ্ঠান প্লাস্টিক দূষণ কমানোর বার্তা দেয়, তাদের দৈনন্দিন ব্যবহার্য পণ্যে এমন উপাদান কেন থাকবে?

সবচেয়ে উদ্বেগের বিষয় হলো, টুথপেস্ট এমন একটি পণ্য যা প্রতিদিন শিশু থেকে বৃদ্ধ—সবাই ব্যবহার করেন। দাঁত ব্রাশ করার সময় অতি ক্ষুদ্র এসব কণা শরীরে প্রবেশের সম্ভাবনা নিয়ে উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে পণ্যের লেবেলে এ ধরনের উপাদানের তথ্য না থাকায় ভোক্তাদের জানার অধিকার নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে।

ইএসডিওর মহাসচিব ও জ্যেষ্ঠ কারিগরি উপদেষ্টা শাহরিয়ার হোসেন বলেন, "প্রতিদিন ব্যবহার করা একটি পণ্যে মাইক্রোপ্লাস্টিক থাকতে পারে—এ বিষয়ে অধিকাংশ ভোক্তাই জানেন না। তাই পণ্যের লেবেলে উপাদান উল্লেখ বাধ্যতামূলক করা, জনসচেতনতা বাড়ানো এবং নিয়ন্ত্রক তদারকি জোরদার করা জরুরি।"

বাংলাদেশ স্ট্যান্ডার্ডস অ্যান্ড টেস্টিং ইনস্টিটিউশনের (বিএসটিআই) উপপরিচালক (রসায়ন) মো. মনজুরুল করিম বলেন, "টুথপেস্টের জাতীয় মানে বর্তমানে ৪০টি অনুমোদিত উপাদান ও কণার আকারের সীমা নির্ধারণ করা আছে। মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষয়টি বিবেচনায় নিয়ে টুথপেস্টের মান সংশোধনের বিষয়টি ভাবা হচ্ছে।"

এদিকে ইএসডিওর দেশব্যাপী ২ হাজার ৭৬০ জনের ওপর পরিচালিত জরিপে দেখা গেছে, ৪১ দশমিক ৯ শতাংশ মানুষ টুথপেস্টে মাইক্রোপ্লাস্টিকের বিষয়ে আগে কখনো শোনেননি। ৩১ দশমিক ৩ শতাংশ শুনলেও বিস্তারিত জানেন না। মাত্র ২৬ দশমিক ৯ শতাংশ এ বিষয়ে সচেতন বলে জানিয়েছেন। জরিপে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত টুথপেস্ট ব্র্যান্ড হিসেবে মেডিপ্লাসের নাম এসেছে। এরপরই রয়েছে ক্লোজআপ ও পেপসোডেন্ট।

গবেষণাটি প্রকাশের পর এখন ভোক্তাদের প্রত্যাশা, সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলো এ বিষয়ে স্পষ্ট ব্যাখ্যা দেবে, প্রয়োজনে পণ্যের উপাদান পুনর্মূল্যায়ন করবে এবং ভবিষ্যতে স্বচ্ছ লেবেলিং নিশ্চিত করবে। একই সঙ্গে নিয়ন্ত্রক সংস্থাগুলোর কার্যকর নজরদারি ও মানদণ্ড প্রণয়নের দাবিও জোরালো হয়েছে।

নিউজটি পোস্ট করেছেন : Insider News

কমেন্ট বক্স
সর্বশেষ সংবাদ
করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর

করোনাকালে বাড়লেও ক্রমেই কমছে স্টার্টআপে বিনিয়োগ, নীতি সহজ কর