চট্টগ্রামের চিকিৎসাসেবার ইতিহাসে আস্থা, মানবিকতা ও সেবার প্রতীক পাহাড়তলী চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র (সিইআইটিসি)। স্বাধীনতার পর অন্ধ ও দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে গড়ে ওঠা এ প্রতিষ্ঠানটি কয়েক দশকে অসংখ্য মানুষের চোখের চিকিৎসায় গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। তবে সেই প্রতিষ্ঠানই এখন অভিযোগ, নথি জালিয়াতি এবং নিয়ন্ত্রণের দ্বন্দ্বকে ঘিরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে।
অভিযোগ উঠেছে, প্রতিষ্ঠানের নিয়ন্ত্রণ নিজের হাতে কেন্দ্রীভূত করতে প্রয়াত চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. রবিউল হোসেন প্রতিষ্ঠার শুরুর সময়ের কিছু দাপ্তরিক নথিতে কারসাজি করেছিলেন। বিশেষ করে ১৯৭৩ সালের একটি গুরুত্বপূর্ণ সাংগঠনিক নথিতে সম্পাদকের পদসংক্রান্ত তথ্য পরবর্তী সময়ে পরিবর্তন করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। আর তাঁর মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির উত্তরাধিকার ও নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে দুই ছেলের মধ্যে বিরোধের কারণে পুরোনো সেই নথি ও সিদ্ধান্তগুলো আবারও সামনে এসেছে।
যেভাবে যাত্রা শুরু
অনুসন্ধানে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী, ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধের পর যুদ্ধবিধ্বস্ত বাংলাদেশে অন্ধ মানুষের চিকিৎসাসেবা নিশ্চিত করতে চট্টগ্রামের একদল বিশিষ্ট ব্যক্তি উদ্যোগ নেন। তাঁদের প্রচেষ্টায় ১৯৭৩ সালের ২৪ মার্চ গঠিত হয় ‘বাংলাদেশ অন্ধ কল্যাণ সমিতি, চট্টগ্রাম’-এর অ্যাডহক কমিটি।
ওই কমিটিতে শিল্পপতি এ. কে. খানকে সভাপতি করা হয়। সহসভাপতি ছিলেন চট্টগ্রাম মেডিকেল কলেজের অধ্যক্ষ ডা. এস. জোহা, চক্ষু বিশেষজ্ঞ ডা. এ. কে. এম. আবু জাফর এবং সমাজসেবা অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক জওশন আরা রহমান। যুগ্ম সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব পান ডা. কামাল এ. খান ও ডা. এস. আর. দাশ। কোষাধ্যক্ষ ছিলেন এলিট পেইন্ট লিমিটেডের ব্যবস্থাপনা পরিচালক সিরাজ উদ্দিন আহমদ। চক্ষু বিশেষজ্ঞসহ বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার আরও ১৮ জনকে সদস্য করা হয়।
প্রতিষ্ঠার শুরুতে নিজস্ব কোনো ভবন ছিল না। চট্টগ্রাম জেনারেল হাসপাতালের আন্দরকিল্লা ক্যাম্পাসের একটি ছোট কক্ষে অস্থায়ী বহির্বিভাগ চালু করা হয়। পরে রোগীর সংখ্যা বাড়লে সেটি ৪০ শয্যার হাসপাতালে রূপ নেয়। একপর্যায়ে ইংল্যান্ডের ‘রয়্যাল কমনওয়েলথ সোসাইটি ফর দ্য ব্লাইন্ড’-এর পরিচালক স্যার জন উইলসন হাসপাতালটির উদ্বোধন করেন।
রেলওয়ের ১০ একর জমিতে স্থায়ী ঠিকানা
রোগীর চাপ বাড়তে থাকায় স্থায়ী হাসপাতাল নির্মাণের উদ্যোগ নেওয়া হয়। এরই ধারাবাহিকতায় ১৯৭৮ সালের ২১ আগস্ট বাংলাদেশ রেলওয়ের মালিকানাধীন প্রায় ১০ একর জমি নামমাত্র মূল্যে হাসপাতালের জন্য বরাদ্দ দেওয়া হয়।
পরের বছর, ১৯৭৯ সালের ১৯ এপ্রিল রাষ্ট্রপতি জিয়াউর রহমান নিজ হাতে ‘চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র’-এর স্থায়ী ভবনের ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন।
রাষ্ট্রপতির সম্পৃক্ততায় প্রকল্পটির প্রতি দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থার আস্থা আরও বাড়ে। জার্মানির আন্দেরী হিলফে এবং ব্রিটিশ সমাজসেবক স্যার জন উইলসনসহ বিভিন্ন পক্ষের সহযোগিতায় নির্মাণকাজ এগিয়ে যায়। প্রায় চার বছর পর ১৯৮৩ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি পাহাড়তলীর ফয়’স লেকসংলগ্ন ক্যাম্পাসে হাসপাতালটির আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হয়।
হারিয়ে যাওয়া মূল নথি, রয়ে গেছে অনুলিপি
অনুসন্ধানে উঠে এসেছে আরও চাঞ্চল্যকর তথ্য। প্রতিষ্ঠানের প্রাথমিক অ্যাডহক কমিটির মূল দলিলটি সময়ের ব্যবধানে হারিয়ে গেলেও বিভিন্ন ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠানের কাছে সংরক্ষিত অনুলিপিতে সেই সময়ের তথ্য পাওয়া যায় বলে সংশ্লিষ্টদের দাবি।
এসব নথি অনুযায়ী, শিল্পপতি এ. কে. খান ছিলেন প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি। ১৯৮৫ সালের ১০ ফেব্রুয়ারি সম্পাদিত ট্রাস্ট ডিডেও তাঁকে প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান হিসেবে উল্লেখ করা হয়। ১৯৯১ সালে মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তিনি প্রতিষ্ঠানটির নেতৃত্বে ছিলেন। এরপর প্রকৌশলী মাহমুদুল ইসলাম এবং পরে একুশে পদকপ্রাপ্ত সাংবাদিক এম. এ. মালেক চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পালন করেন।
যে জায়গায় উঠছে নথি জালিয়াতির অভিযোগ
তবে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন উঠেছে ১৯৭৩ সালের অ্যাডহক কমিটির নথি নিয়ে।
অনুসন্ধানে পাওয়া ওই নথির অনুলিপি পর্যালোচনায় দেখা যায়, ‘সেক্রেটারি’ বা সম্পাদকের ঘরটি টাইপ করা একটি ড্যাশ (—) দিয়ে ফাঁকা রাখা হয়েছে। কিন্তু একই নথির সাধারণ সদস্য তালিকায় দ্বিতীয় নম্বরে স্পষ্টভাবে উল্লেখ রয়েছে—‘ডাঃ আর. হোসেন, চক্ষু বিশেষজ্ঞ, ৬৪, জামাল খান রোড, চট্টগ্রাম।’
অভিযোগকারীদের দাবি, নথিটির এই অংশটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কারণ একই কমিটিতে একজন ব্যক্তিকে একই সঙ্গে সাধারণ সদস্য ও সম্পাদক হিসেবে দেখানোর সাংগঠনিক যৌক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। তাঁদের বক্তব্য, ডা. রবিউল হোসেন যদি শুরু থেকেই সম্পাদক হিসেবে মনোনীত হয়ে থাকতেন, তাহলে তাঁকে সাধারণ সদস্য তালিকায় রাখার প্রয়োজন ছিল না।
আর এখানেই সামনে এসেছে মূল অভিযোগ।
‘পরবর্তীতে নিজের নাম বসানোর’ অভিযোগ
১৯৮৫ সালের ট্রাস্ট ডিডে ডা. রবিউল হোসেনকে ‘অবৈতনিক সাধারণ সম্পাদক’ হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে এবং তিনি ওই দলিলে স্বাক্ষর করেন বলে সংশ্লিষ্ট নথিতে দেখা যায়।
অভিযোগকারীদের দাবি, প্রতিষ্ঠাতা সভাপতি এ. কে. খানের মৃত্যুর পর কোনো এক সময়ে ১৯৭৩ সালের মূল নথিতে সম্পাদকের জন্য ফাঁকা রাখা স্থানে ডা. রবিউল হোসেনের নাম যুক্ত করা হয়। এর মাধ্যমে তাঁকে ১৯৭৩ সাল থেকেই প্রতিষ্ঠানের ‘প্রতিষ্ঠাতা সম্পাদক’ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করার চেষ্টা করা হয়েছিল বলে অভিযোগ তাঁদের।
নথির পরিবর্তন কীভাবে প্রভাব ফেলল?
অনুসন্ধানসংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর দাবি, বিতর্কিত এই নথিকে পরবর্তী সময়ে বিভিন্ন প্রশাসনিক ও সাংগঠনিক কার্যক্রমে ভিত্তি হিসেবে ব্যবহার করা হয়ে থাকতে পারে। এর ফলে প্রতিষ্ঠানের নেতৃত্ব ও নিয়ন্ত্রণ ধীরে ধীরে একটি নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর হাতে কেন্দ্রীভূত হওয়ার সুযোগ তৈরি হয়।
অভিযোগকারীদের ভাষ্য, বাংলাদেশ জাতীয় অন্ধ কল্যাণ সমিতি (বিএনএসবি), দেশি-বিদেশি দাতা সংস্থা এবং অসংখ্য শুভানুধ্যায়ীর সহযোগিতায় গড়ে ওঠা একটি জনকল্যাণমূলক প্রতিষ্ঠানকে ব্যক্তিকেন্দ্রিক নিয়ন্ত্রণে নেওয়ার চেষ্টা হয়ে থাকলে সেটি শুধু প্রশাসনিক অনিয়ম নয়; বরং প্রতিষ্ঠানের ইতিহাস ও প্রতিষ্ঠাতাদের অবদান নিয়েও গুরুতর প্রশ্ন তৈরি করে।
মৃত্যুর পর সামনে দুই ছেলের বিরোধ
ডা. রবিউল হোসেনের মৃত্যুর পর প্রতিষ্ঠানটির উত্তরাধিকার ও নিয়ন্ত্রণকে ঘিরে তাঁর দুই ছেলের মধ্যে বিরোধ প্রকাশ্যে এসেছে বলে একাধিক সূত্রের দাবি। আর সেই বিরোধের জেরেই পুরোনো নথি, সিদ্ধান্ত এবং নেতৃত্ব হস্তান্তরের নানা বিষয় নতুন করে সামনে এসেছে।
এক পক্ষের অভিযোগ, দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক কাঠামো ও নথিপত্রের ধারাবাহিকতা খতিয়ে দেখলেই প্রতিষ্ঠানটির নিয়ন্ত্রণ কীভাবে একটি পরিবারকেন্দ্রিক কাঠামোর দিকে গেছে, তার চিত্র পাওয়া যাবে। অন্যদিকে, অভিযোগগুলোর সত্যতা নিয়ে সংশ্লিষ্টদের বক্তব্য ও মূল নথির যাচাই ছাড়া চূড়ান্ত সিদ্ধান্তে পৌঁছানো সম্ভব নয়।
চট্টগ্রাম চক্ষু হাসপাতাল ও প্রশিক্ষণ কেন্দ্র কোনো ব্যক্তির ব্যক্তিগত সম্পত্তি নয়—এমনটাই মনে করছেন সংশ্লিষ্টদের অনেকে। তাঁদের মতে, প্রতিষ্ঠানটির জমি, ট্রাস্ট ডিড, প্রতিষ্ঠাকালীন নথি, দাতা সংস্থার অর্থায়ন এবং দীর্ঘদিনের প্রশাসনিক রেকর্ড স্বচ্ছভাবে যাচাই করে প্রকৃত ইতিহাস সামনে আনা প্রয়োজন।
সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্ন এখন একটাই—১৯৭৩ সালের সেই নথিতে সম্পাদকের ঘরটি যদি সত্যিই শুরু থেকেই ফাঁকা থাকে, তাহলে সেখানে পরে কার নাম, কখন এবং কীভাবে যুক্ত হলো?
Insider News