ঢাকা | বঙ্গাব্দ

সেবার আড়ালে বালুচড়া বিআরটিএতে রুবেল-বাবুর ‘মার্কা’ দাপটে দালালচক্র

  • নিউজ প্রকাশের তারিখ : Sep 4, 2026 ইং
সেবার আড়ালে বালুচড়া বিআরটিএতে রুবেল-বাবুর ‘মার্কা’ দাপটে দালালচক্র ছবির ক্যাপশন: রুবেল-বাবুর
ad728
চট্টগ্রাম বিভাগীয় বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষের (বিআরটিএ) কার্যালয়ে ডিজিটাল সেবার পাশাপাশি সক্রিয় রয়েছে দালালনির্ভর একটি ব্যবস্থা। যানবাহনের মালিকানা পরিবর্তন, নিবন্ধন, ফিটনেস, লাইসেন্সসহ বিভিন্ন সেবা নিতে সরাসরি আসা গ্রাহকদের দিনের পর দিন ঘুরতে হলেও দালালের মাধ্যমে আসা ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তি হয় বলে অভিযোগ রয়েছে। বালুচড়া কার্যালয়ের এই ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছেন রুবেল দাশ ও বাবু কান্তি দাশ। তাদের দেওয়া ‘মার্কা’ থাকা ফাইল অগ্রাধিকার ভিত্তিতে নিষ্পত্তি হয় বলে একাধিক সূত্র জানিয়েছে। এ কাজে বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের পরিচালক (ইঞ্জি.) মো. মাসুদ আলম ও উপপরিচালক (ইঞ্জি.) সৈয়দ আইনুল হুদা চৌধুরীর প্রশ্রয় রয়েছে বলেও দাবি করা হয়েছে।

২০২৩ সালের ২৩ মে বিআরটিএর কেন্দ্রীয় কার্যালয় থেকে জারি করা এক নির্দেশনায় সেবা গ্রহণের বিভিন্ন ফি ব্যাংক ও মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের (এমএফএস) মাধ্যমে পরিশোধের ব্যবস্থা জোরদার করা হয়। নগদ লেনদেন কমানো, গ্রাহকের হয়রানি বন্ধ এবং দালালের ওপর নির্ভরতা কমানোই ছিল এর অন্যতম উদ্দেশ্য। তবে বালুচড়া কার্যালয়ে সেবা নিতে আসা কয়েকজন গ্রাহকের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, ডিজিটাল ব্যবস্থার সুযোগ থাকলেও বাস্তবে অনেক কাজেই তাদের দালালের শরণাপন্ন হতে হচ্ছে।

সরাসরি জমা দেওয়া ফাইল দিনের পর দিন পড়ে থাকলেও ‘সেটেল’ বা ‘মার্কা’ দেওয়া ফাইল দ্রুত সংশ্লিষ্ট শাখায় চলে যায় বলে জানা গেছে। বিআরটিএর কোনো আনুষ্ঠানিক প্রক্রিয়ায় ‘মার্কা’ নামে কোনো ব্যবস্থা নেই। তবে দালালচক্রের মধ্যে এই সংকেত ব্যবহার করে তাদের সিন্ডিকেটের মাধ্যমে ফাইল আলাদা করে দ্রুত কাজ করানো হয়।

এই ব্যবস্থায় রুবেল দাশের ভূমিকা নিয়ে সবচেয়ে বেশি আলোচনা রয়েছে। তিনি বিআরটিএর একজন অস্থায়ী কর্মচারী এবং হালিশহর সার্কেল-১-এর মালিকানা শাখায় বসেন। সেখানে নিয়মিত কর্মকর্তা-কর্মচারীদের পাশাপাশি তারও ফাইল নিয়ে কাজ করার সুযোগ রয়েছে বলে জানা গেছে। তার কাছে ফাইল দিলে কাজ দ্রুত হয়—এমন ধারণা ছড়িয়ে পড়ায় অনেক গ্রাহক সরাসরি তার মাধ্যমে কাজ করান। ফাইল দ্রুত নিষ্পত্তির বিনিময়ে অতিরিক্ত অর্থ লেনদেনের কথাও বিভিন্ন পর্যায়ে উঠে এসেছে।

২০২৩ সালের ২৩ মে বিআরটিএর কেন্দ্রীয় কার্যালয় একটি বিজ্ঞপ্তির মাধ্যমে ঘোষণা দেয়, ব্যাংক বা মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিসের মাধ্যমে ফি পরিশোধ করলেই সেবা পাওয়া যাবে। এ পদক্ষেপের উদ্দেশ্য ছিল ঘুষ ও দালালনির্ভরতা বন্ধ করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করা। কিন্তু চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ে বাস্তবতা সম্পূর্ণ ভিন্ন। টাকা জমা দিয়ে গ্রাহক ফাইল জমা দিলেও সেই ফাইল দিনের পর দিন পড়ে থাকে। যদি ‘সেটেল’ না হয়—অর্থাৎ দালাল সিন্ডিকেটের অনুমোদন না থাকে—তবে কোনো ফাইলই কার্যকর হয় না। অথচ দালালের হাত ঘুরে আসা ‘বিশেষ চিহ্নিত’ ফাইল মুহূর্তেই নিষ্পত্তি পায়।

রুবেল দাশ বিআরটিএর অস্থায়ী কর্মচারী। তবে তিনি নিয়োগপ্রাপ্ত কর্মকর্তাদের মতো হালিশহর সার্কেল-১ কার্যালয়ের মালিকানা সেকশনে নির্দ্বিধায় চেয়ার-টেবিল নিয়ে বসে অফিস পরিচালনা করেন। মালিকানা সেকশনে কোনো কাজ রুবেল দাশের ইশারা ছাড়া হয় না। তার চাহিদা অনুযায়ী ঘুষ দিলে সেই কাজ দ্রুত সম্পন্ন হয়। এ ছাড়া তার আরেকটি কাজ হলো—২০১৭ থেকে ২০২০ মডেলের প্রাইভেট গাড়ির জন্য ২০২১-২০২৪ সালের ভুয়া রেজিস্ট্রেশন ও অন্যান্য কাগজপত্র তৈরি করা। বিশ্বস্ত সূত্র বলছে, এই ভুয়া ডকুমেন্টস বিআরটিএর ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের প্রত্যক্ষ সহযোগিতায় প্রস্তুত করা হয়। পরে গাড়িগুলো বিভিন্ন ব্যক্তির কাছে বিক্রি করে দেওয়া হয়।

আরেক দালাল বাবু কান্তি দাশের নিয়ন্ত্রণে রয়েছে বিআরটিএ কার্যালয়ের ফাইল চলাচল। অভিযোগ রয়েছে, তিনি ‘মার্কা’ নামক এক ধরনের গোপন সংকেত ব্যবহার করেন, যা সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের জানিয়ে দেয়—এই ফাইলটি দালালচক্রের ‘স্পেশাল কেস’। বাবু কান্তি দাশের ‘মার্কা’ সংবলিত ফাইল অগ্রাধিকার পায় এবং দ্রুত নিষ্পত্তি হয়। অন্যদিকে, সাধারণ গ্রাহক দিনের পর দিন ঘুরেও সেবা পান না। জানা গেছে, বাবু দাশ এই দালালি থেকে কোটি টাকার মালিক হয়েছেন। তার গ্রামের বাড়িতে নির্মাণ করেছেন একটি নান্দনিক বাড়ি এবং নগরীর দিদার মার্কেট এলাকার ঈশ্বরদী লাইনে কিনেছেন বিলাসবহুল ফ্ল্যাট।

বাবু দাশ সাবেক প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার বিশেষ সহকারী ও আওয়ামী লীগের দপ্তর সম্পাদক বিপ্লব বড়ুয়া এবং চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক ৩২ নম্বর আন্দরকিল্লা ওয়ার্ড কাউন্সিলর জহর লাল হাজারীর অনুসারী। এই দুজনের দাপট দেখিয়ে আওয়ামী লীগ সরকারের আমলে বিআরটিএর দালালি করে কোটি কোটি টাকা ইনকাম করেন। অভিযোগ রয়েছে, ‘জুলাই বিপ্লব’ নামে পরিচিত ছাত্র-জনতার আন্দোলন দমনে জহর লাল হাজারীকে অর্থসহায়তা দিয়েছিলেন বাবু দাশ। আওয়ামী লীগ সরকার পতনের পর কিছুদিন আত্মগোপনে থাকার পর আবারও বিআরটিএর দালালি কাজে সক্রিয় হয়েছেন বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের পরিচালক ও উপপরিচালকের আশীর্বাদে।

বাবু কান্তি দাশের ফেসবুক প্রোফাইল ঘেঁটে এবং অনুসন্ধান করে জানা যায়, তার গ্রামের বাড়ি চট্টগ্রাম জেলার সাতকানিয়া উপজেলার ১২ নম্বর ধর্মপুর ইউনিয়নের ৩ নম্বর ওয়ার্ডের নন্দী পাড়া গ্রামে। তিনি হারাধন দাশের পুত্র। তার প্রোফাইলে এখনও বিভিন্ন আওয়ামী লীগ নেতার সঙ্গে ছবি এবং বিভিন্ন পোস্টার রয়েছে।

বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগের বর্তমান পরিচালক মো. মাসুদ আলমের বিরুদ্ধে অভিযোগ রয়েছে—তিনি যে অফিসেই দায়িত্ব পালন করেছেন, সেখানেই গড়ে তুলেছেন দুর্নীতির অবকাঠামো। চট্টগ্রামে এসে তিনি দালালদের মাধ্যমে সমন্বিত দুর্নীতি কাঠামো তৈরি করেছেন। বলা হচ্ছে, রুবেল ও বাবু এই দুই দালাল শুধু তার ঘনিষ্ঠ নন, বরং অবৈধ লেনদেনের প্রধান বাহক। ফাইল থেকে ফ্ল্যাট—প্রতিটি ঘুষের অঙ্ক, দালাল থেকে অফিসারদের ভাগ, সবই চলে এই সিন্ডিকেটের মাধ্যমে।

বিভিন্ন সেবা নিতে এসে সাধারণ গ্রাহকরা প্রতিনিয়ত হয়রানির শিকার হচ্ছেন। সরাসরি সেবা নিতে গেলে ফাইল মাসের পর মাস পড়ে থাকে। অথচ দালালের মাধ্যমে সেই কাজ ঘণ্টার মধ্যেই সম্পন্ন হয়।

সেবা নিতে আসা একজন গ্রাহক বলেন, ‘ব্যাংকে টাকা জমা দিয়ে কাজ হয় না, দালালের টাকা না দিলে অফিস ফাইলই গ্রহণ করে না।’ তার ভাষ্য, সরাসরি ফাইল জমা দিলে মাসের পর মাস সময় লাগলেও দালালের মাধ্যমে টাকা দিলে কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই কাজ হয়ে যায়। এ ধরনের পরিস্থিতির পরও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা না থাকায় দালালদের দৌরাত্ম্য বাড়ছে বলে মনে করেন তিনি।

তবে দালালদের বিরুদ্ধে অভিযানও চালাচ্ছে বিআরটিএ। গত ১৮ আগস্ট মঙ্গলবার বিআরটিএ চট্টগ্রাম বিভাগীয় কার্যালয়ের মোবাইল কোর্ট-১২-এর অভিযানে চট্টগ্রাম মেট্রো-১ কার্যালয় থেকে দালালির সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগে দুজনকে এক মাসের বিনাশ্রম কারাদণ্ড দেওয়া হয়। নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ফাহমিদা মোস্তফার নেতৃত্বে পরিচালিত অভিযানে দণ্ডপ্রাপ্তরা হলেন—বাঁশখালীর চাপাছড়ি এলাকার মো. মাসুদ আলী (৩১), পিতা মো. মোর্তজা আলী এবং আনোয়ারার শুলকাটা এলাকার মো. হাশেম (৪৫), পিতা নোয়া মিয়া।

এ ছাড়া বড়পুল এলাকায় পরিচালিত পৃথক অভিযানে সড়ক পরিবহন আইন, ২০১৮-এর বিভিন্ন ধারা লঙ্ঘনের দায়ে ১১টি মামলা করা হয়। এসব মামলায় মোট ২৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় এবং একটি অটোটেম্পু জব্দ করা হয়।

আটক হলেও অধরা রুবেল-বাবু


নিউজটি পোস্ট করেছেন : Insider News

কমেন্ট বক্স
চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তে আবার উত্তেজনা, হামলায় ৩ বাংলাদেশি

চাঁপাইনবাবগঞ্জের সীমান্তে আবার উত্তেজনা, হামলায় ৩ বাংলাদেশি