দলীয় নাম ভাঙিয়ে পটিয়া বাসে মাসে লাখ টাকার চাঁদাবাজি
-
নিউজ প্রকাশের তারিখ :
Jul 27, 2026 ইং
ছবির ক্যাপশন: পটিয়া সড়কে বাস থেকে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ
“দিন-রাত গাড়ি চালিয়ে সংসার চালাই। কিন্তু গাড়ি থেকে চাঁদা দিতে দিতে নিজের পরিবারের জন্য কিছুই রাখতে পারি না। সন্তানের পড়াশোনা, ঘরবাড়ি—সবকিছুই কঠিন হয়ে গেছে। আমাদের কষ্টের টাকায় অন্যরা সুবিধা নিচ্ছে।” — পটিয়া রুটের এক পরিবহন চালকের এই আক্ষেপ যেন পুরো পরিবহন খাতের দীর্ঘদিনের এক বাস্তব চিত্র।
পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি শুধু চালকদের আর্থিক ক্ষতিই করছে না, এর প্রভাব পড়ছে সাধারণ যাত্রী ও পুরো পরিবহন ব্যবস্থাপনায়। অতিরিক্ত অর্থের চাপ সামলাতে অনেক সময় চালকরা বাধ্য হন ভাড়া বাড়াতে কিংবা নানা অনিয়মের আশ্রয় নিতে। ফলে ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছেন সাধারণ মানুষও।
চট্টগ্রামের পটিয়া সড়কে মিনিবাস ও বড় গাড়ি থেকে রাজনৈতিক পরিচয় ব্যবহার করে চাঁদা আদায়ের অভিযোগ উঠেছে। স্থানীয় পরিবহন সংশ্লিষ্টদের দাবি, বিভিন্ন রুটে গাড়ি চলাচল করলেই নির্দিষ্ট ব্যক্তিদের কাছে টাকা দিতে হচ্ছে। বিএনপির নাম ভাঙিয়ে একটি চক্র এসব অর্থ আদায় করছে বলেও অভিযোগ করেছেন তারা।
তাদের অভিযোগ, বৈধ-অবৈধ নির্বিশেষে বিভিন্ন গাড়ি থেকে নিয়মিত অর্থ আদায় করা হচ্ছে। এসব অর্থ কোথায় যাচ্ছে, কারা নিয়ন্ত্রণ করছে এবং এর পেছনে কারা জড়িত—তা খতিয়ে দেখতে প্রশাসনের কাছে তদন্তের দাবি জানিয়েছেন পরিবহন শ্রমিকরা।
তথ্য অনুযায়ী, পটিয়া রুটে বড় গাড়ি ‘বিলাসী’ নামে চলাচলকারী গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৯০টি। এর মধ্যে ৪০টি গাড়ির বৈধ পারমিট থাকলেও ৫০টি গাড়ি পারমিট ছাড়া চলাচল করছে বলে অভিযোগ রয়েছে। এসব গাড়ি থেকে মো. ফারুক প্রতি গাড়িতে ১২০ টাকা এবং ‘মেম্বার’ নামে পরিচিত এক ব্যক্তি ৩০ টাকা করে আদায় করছেন বলে অভিযোগ উঠেছে।
এই হিসাবে প্রতিদিন ৯০টি গাড়ি থেকে ১৫০ টাকা করে আদায় হলে চাঁদার পরিমাণ দাঁড়ায় প্রায় ১৩ হাজার ৫০০ টাকা। মাসে ৩০ দিন হিসাবে এই অর্থের পরিমাণ প্রায় ৪ লাখ ৫ হাজার টাকা।
পাঁচুরিয়া রোডেও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে। এই রুটে চলাচলকারী গাড়ির সংখ্যা প্রায় ৪০টি। এর মধ্যে ১৫টির বৈধ পারমিট এবং ২৫টি অবৈধভাবে চলাচল করছে বলে দাবি করা হয়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, মো. তৈয়ব প্রতি গাড়ি থেকে ১৩০ টাকা এবং মন্টু ১০০ টাকা করে নিচ্ছেন।
হিসাব অনুযায়ী, পাঁচুরিয়া রুটে প্রতিদিন প্রায় ৯ হাজার ২০০ টাকা এবং মাসে প্রায় ২ লাখ ৭৬ হাজার টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে।
অন্যদিকে শান্তির হাট থেকে বাদামতল রুটে ছোট গাড়ি ও মিনিবাস রয়েছে প্রায় ২১০টি। এর মধ্যে ৯০টি বৈধ এবং ১২০টি পারমিট ছাড়া চলাচল করছে বলে দাবি সংশ্লিষ্টদের। অভিযোগ রয়েছে, আব্বাস প্রতি গাড়ি থেকে ১০০ টাকা এবং মো. শুক্কুর ৩০ টাকা করে আদায় করছেন।
এই রুটে প্রতিদিন প্রায় ২৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং মাসে প্রায় ৮ লাখ ১৯ হাজার টাকা চাঁদা আদায়ের হিসাব পাওয়া গেছে।
পরিবহন চালকদের অভিযোগ, এসব চাঁদার পাশাপাশি পুলিশের নাম ব্যবহার করেও প্রতি গাড়ি থেকে মাসে প্রায় ২ হাজার ৫০০ টাকা পর্যন্ত নেওয়া হয়। তবে পুলিশ প্রশাসনের পক্ষ থেকে এ ধরনের অর্থ আদায়ের কোনো অনুমোদন নেই বলে জানানো হয়েছে।
চালকদের দাবি, পরিবহন খাতে চাঁদাবাজি বন্ধ না হলে শুধু শ্রমিকরাই নয়, এর নেতিবাচক প্রভাব পড়বে যাত্রীসেবা, সড়ক ব্যবস্থাপনা ও স্থানীয় অর্থনীতিতেও। তারা বলছেন, একটি গাড়ি চালাতে জ্বালানি, মেরামত, শ্রমিক খরচসহ নানা ব্যয় বহন করতে হয়। এর সঙ্গে নিয়মিত চাঁদা যোগ হওয়ায় অনেক মালিক ও চালক আর্থিক সংকটে পড়ছেন।
এছাড়া বিএনপি ও নগর যুবদলের পদপ্রত্যাশী কয়েকজন নেতার অনুসারীদের বিরুদ্ধেও এসব কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগ উঠেছে।
চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ কমিশনার শওকত আলী বলেন,পরিবহন খাতে চাঁদাবাজির কোনো তথ্য পাওয়া গেলে জড়িতদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে। চাঁদাবাজি, কিশোর গ্যাংসহ অপরাধমূলক কর্মকাণ্ডের বিরুদ্ধে পুলিশের অবস্থান কঠোর থাকবে।
চট্টগ্রাম জজকোর্টের আইনজীবী অ্যাডভোকেট আব্দুল হাকিম বলেন, বাংলাদেশ দণ্ডবিধি ১৮৬০–এর ধারা ৩৮৫ ও ৩৮৬ অনুযায়ী ভয়ভীতি প্রদর্শনের মাধ্যমে অর্থ আদায় এবং জোরপূর্বক চাঁদাবাজি দণ্ডনীয় অপরাধ। একইসঙ্গে ধারা ৫০৬ অনুযায়ী হুমকি প্রদানের মাধ্যমে আর্থিক সুবিধা আদায় করাও অপরাধের অন্তর্ভুক্ত।
নগর বিএনপির পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, দলের নাম ব্যবহার করে কেউ চাঁদাবাজি করলে অভিযোগের ভিত্তিতে সাংগঠনিক ব্যবস্থা নেওয়া হবে। দলীয় পরিচয় ব্যবহার করে কেউ অপকর্ম করলে তার দায় দল নেবে না বলেও জানানো হয়।
স্থানীয়রা বলছেন, রাজনৈতিক পরিচয় বা প্রভাব ব্যবহার করে কোনো ব্যক্তি বা গোষ্ঠী যেন পরিবহন খাত নিয়ন্ত্রণ করতে না পারে, সে বিষয়ে কার্যকর ব্যবস্থা প্রয়োজন। তারা চাঁদাবাজির অভিযোগ তদন্ত করে জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানিয়েছেন।
নিউজটি পোস্ট করেছেন :
Insider News
কমেন্ট বক্স